যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় খাতের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এখন দেশটির অর্থনীতিকেই হুমকিতে ফেলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক চাপে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়নির্ভর বিভিন্ন অঞ্চল আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর ইউরো নিউজ।
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত বছর ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দিয়েছে এবং অর্থনীতিতে ৮ হাজার কোটি পাউন্ড বা ১০ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজন (জিভিএ) করেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ব্রিটিশ অর্থনীতিতে লন্ডন ও সাউথইস্টের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সর্বোচ্চ অবদান রাখে, জিভিএর আকার ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে নর্থইস্ট ও ওয়েলসের মতো অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়নির্ভর। তবে জিডিপিতে অঞ্চলগুলোর অবদান তুলনামূলক কম। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম আর্থিক চাপে থাকায় এসব অঞ্চল বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ১৬৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেখানে তা নির্ণয় করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিবিদ ডেভিড শ্মুটজ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় খাতে সবচেয়ে বেশি উপকারভোগী অঞ্চল লন্ডন ও সাউথইস্ট। তা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় খাতের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল এ অঞ্চলগুলো। কারণ এখানকার আয় বেশি ও অর্থনীতি বহুমুখী।’
এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘নর্থইস্ট ও ওয়েলসের অর্থনীতি অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। এসব অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব মোট জিভিএর যথাক্রমে ৬ ও ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে সমগ্র যুক্তরাজ্যে গড় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।’
প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আর্থিক সংকটের মূল কারণ হলো ২০১২ সাল থেকে দেশীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি স্থির রয়েছে। এটি মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য প্রভাব মিলিয়ে আয় কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ভিসায় ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের কারণে বিদেশীদের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা স্নাতক ডিগ্রির জন্য সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড পরিশোধ করেন। বিদেশী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ৩৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
আয় বাবদ এ লোকসানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা তহবিল ঘাটতি। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের হিসাব অনুযায়ী, গবেষণার প্রকৃত ব্যয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে তহবিল পায়, তার মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৩০ কোটি পাউন্ড।
ডেভিড শ্মুটজ জানান, ১৯৯২ সালের পর প্রতিষ্ঠা হয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কারণ তারা বিদেশী শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল, আয় মূলত টিউশন ফি থেকে আসে। দীর্ঘদিনের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক বেশি গবেষণা তহবিল পায় এবং বড় আর্থিক তহবিল থাকায় তাদের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।
এখন তহবিল সংকটের ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। নর্থইস্ট ও ওয়েলসের মতো অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত চাকরিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি মজুরি দেয়। কাজের উৎপাদনশীলতাও বেশি। বিদেশী শিক্ষার্থীদের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী ও সাপ্লাই চেইনের ব্যয় মিলিয়ে অস্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক। এখন বিশ্ববিদ্যালয় খাতের পতন এসব অঞ্চলের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সেবাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি যুক্তরাজ্যের আঞ্চলিক পর্যায়ে বৈষম্য আরো বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হচ্ছে, জাতীয় ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক মডেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। যে অঞ্চলের অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়নির্ভর, সেখানে যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দেউলিয়া হয়ে যায় তবে তা পুরো এলাকায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনটি প্রস্তাব করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি স্থানীয় সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং প্রবৃদ্ধিভিত্তিক পরিকল্পনায় মনোযোগী হয়, তবে তারা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উন্নত করতে পারবে। এতে তারা স্থানীয় দক্ষতার ঘাটতি ও গবেষণার চাহিদার সঙ্গে তাদের কোর্সগুলো আরো ভালোভাবে সমন্বয় করতে পারবে।